ঢাকা , শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মারাত্ত্বক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চৌগাছাবাসী: প্রতি লিটার পানিতে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩১-১০-২০২৬ ০২:৩৯:৪৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩১-১০-২০২৬ ০২:৩৯:৪৯ অপরাহ্ন
মারাত্ত্বক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চৌগাছাবাসী: প্রতি লিটার পানিতে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক ছবি : সংগৃহীত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানবদেহের জন্য প্রতিলিটার পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম। সরকারি মানদণ্ডে দেশে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ধরা হয় ০.০৫ মিলিগ্রাম, কিন্তু যশোরের চৌগাছা উপজেলায় এর চিত্র ভিন্ন। এ উপজেলায় আর্সেনিকের গড় উপস্থিতি ২০ মিলিগ্রাম। এখানকার ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কাজ করছে জাপানের জাইকা ও জেএসটি। সংস্থা দুটির কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক সেচ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্সেনিকমুক্ত ধান উৎপাদনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা সিএসি (কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, ধানের ক্ষেত্রে আর্সেনিকের সহনশীল মাত্রা ধরা হয় ০.৩৫ পিপিএম, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়, কিন্তু চৌগাছা উপজেলায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে আরো বেশি। এখানকার ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে ৫৬ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।

এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক সূত্রে জানা গেছে, ধান ও ভাতে আর্সেনিকের উপস্থিতি সহনশীল রাখতে সেচ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। তারা থ্রিএফফোরডি (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকদের সচেতন করছেন।

এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।

নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান (সানরাইজ) প্রকল্পের অধীনে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জাপানের জাইকা ও জেএসটি (জাপান সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এজেন্সি)-এর কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় এ উপজেলায় আর্সেনিক সহনশীল মাত্রায় নিরাপদ ধান উৎপাদনে কাজ করছে সংস্থাটি।

উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামে ১২টি মডেল প্রস্তুত করা হয়েছে। পৌরসভার হুদোপাড়া, চৌগাছা ইউনিয়নের কয়ারপাড়া, সিংহঝুলী ইউনিয়নের মাজালি, ফুলসারা ইউনিয়নের আড়ারদহ, জগদীশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া, পাতিবিলা ইউনিয়নের সাদিপুর, হাকিমপুর ইউনিয়নের বকশিপুর, নারায়ণপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর, স্বরূপদাহ ইউনিয়নের স্বরূপদাহ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর, ধুলিয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া ও পাশাপোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের মাঠে ধানে আর্সেনিক প্রতিরোধে প্লট প্রস্তুত করা হয়েছে।

সেখানে ১৪৪ জন কৃষক এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।

এছাড়া প্রত্যেক ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মোট ৬০ জন সেচপাম্প মালিকের অধীনে তাদের নিজ উদোগে আর্সেনিকমুক্ত ধান উৎপাদনে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি আগামী ইরি-বোরো মৌসুমে ব্যবহার করা হবে। এরইমধ্যে তাদের সচেতন করার লক্ষ্যে সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সংস্থার উপজেলা সমন্বয়কারী আমিরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘আমাদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর চাল দিয়ে ভাত খেতে হবে। এ কারণে আর্সেনিকমুক্ত বা সহনশীল মাত্রার আর্সেনিকে ধান উৎপাদন করা জরুরি।’

আমিরুল বলেন, দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা কাজ করছি। তবে মূল বিষয় হচ্ছে ধানের আবাদি জমিতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। এটা করতে কৃষি পদ্ধতি ও ত্রিএফফোরডি চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ২০ শতাংশ পানি সাশ্রয় হচ্ছে। এতে ৮ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।

সংস্থার পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, ইরি-বোরো মৌসুমে উপরিভাগে সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলা হয়। ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমে গেলে আর্সেনিকের ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে ধানে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি থাকার ঝুঁকি থাকে।

এ পদ্ধতির মূল কাজ হলো প্রচলিত জলাবদ্ধতার পরিবর্তে তিন দিন জমিতে পানি ধরে রেখে চার দিন শুকানো। এতে মাটির রেডক্স পটেনশিয়াল বেড়ে অক্সিডেটিভ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ কারণে  ধানের চারার আর্সেনিক শোষণ কমে যায়। একইসঙ্গে চালে অজৈব আর্সেনিক মাত্রা উল্লেখযোগভাবে কমে।

আড়ারহদ গ্রামের প্লটের কৃষক ইমদাদুল হক ও মাজালি গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান তপন জানান, ধানে আর্সেনিক থাকতে পারে তা আগে তাদের ধারণা ছিল না। তারা ধানের জমিতে যেভাবে পানি দিতেন, এখন সেভাবে দেন না। এখন   থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছেন তারা।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফেরদৌসী খাতুন বলেন, ধান বা চালে আর্সেনিকের বিষয়ে সরকারি কোনো  উদ্যোগ নেই। তবে পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। আমরা বর্তমানে ১১টি ইউনিয়নে ৯০টি অগভীর নলকূপ দিয়েছি। নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে আঞ্চলিক পানি পরীক্ষাগারে পাঠাচ্ছি। যেখনে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে পানি পরিশোধনের ভ্যাসেল দিচ্ছি।’

সহকারী প্রকৌশলী বলেন, ‘চৌগাছা  উপজেলায় আর্সেনিকের আধিক্য রয়েছে। আগের প্রতিবেদনে গড়ে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, আর্সেনিকের রোগীর সংখ্যা বিষয়ে  আপডেট তথ্য নেই। তবে ইতোপূর্বে বিভিন্ন জরিপে আমরা জানতে পারি, উপজেলায় আর্সেনিক রোগী রয়েছে ১৫০০। উপজেলা হাসপাতালে এখনো রোগীরা আসছেন। তাদেরকে নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হয়। 

ডা. আহসানুল বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এই রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলে রোগ ভালো হওয়া সম্ভব। এই রোগ অবহেলা করা উচিত নয়।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)  ফারজানা ইসলাম বলেন, ধানে আর্সেনিকের বিষয়ে একটি সংস্থা কাজ করছে বলে জেনেছি। এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে এখনো কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে অসভীর নলকূপ দেওয়া হচ্ছে। নলকূপে আর্সেনিক ধরা পড়লে পানি শোধনে সরকারিভাবে ভ্যাসেল দেওয়া হচ্ছে।

ইউএনও আরো বলেন, আর্সেনিক সমস্যা এ অঞ্চলে অনেক দিনের। আমরা যে টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করছি, তার অধিকাংশই এখন নিরাপদ নয়। পানি ব্যবহারে আমাদের সতর্ক থাকা দরকার।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ